Bangladesh
This article was added by the user . TheWorldNews is not responsible for the content of the platform.

দৌলতপুরের দুর্গম চরাঞ্চলে সক্রিয় সাত সশস্ত্র বাহিনী

ভারতীয় সীমান্তবর্তী কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলে সাতটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী সক্রিয় হয়ে উঠেছে। একেকটি বাহিনীতে রয়েছে পঁচিশ থেকে ত্রিশজনের মতো সদস্য। প্রতিটি বাহিনীর কাছে অাছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র। এমন সন্ত্রাসী গ্রুপ বা বাহিনী চরাঞ্চল ছাড়াও উপজেলার অন্যান্য এলাকাতেও রয়েছে। তবে তারা এই মুহূর্তে খুব একটা সক্রিয় নেই। যদিও জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নিষ্ক্রিয় থাকা এসব সন্ত্রাসীদের কদর বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য ঘেঁটে জানা যায়, অর্থনৈতিক কিংবা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের ছায়ায় সক্রিয় থাকা চরাঞ্চলের সাত সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলেছে অপরাধ জগতের এক রমরমা রাজত্ব। বিস্তীর্ণ চরে খাওয়াদাওয়া, বিনোদন, প্রশিক্ষণ, রাতযাপন, মাদক ও নারীসঙ্গ সবকিছুরই ব্যবস্থা আছে এসব বাহিনীর সদস্যদের জন্য। ভারত সীমান্তঘেঁষা ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা দৌলতপুর। উপজেলাটির ৪৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে রয়েছে ভারতীয় সীমান্ত। ফলে এ উপজেলায় অস্ত্র ও মাদকের ছড়াছড়ি অবস্থাও এখন নতুন নয়। এখানে খুব সহজেই মেলে এগুলো।

উপজেলার চরাঞ্চলের চারটি ইউনিয়নের বিশাল এলাকাজুড়ে রয়েছে গোচারণভূমি। সেখানে রাখালের গরুর পাল থেকে অস্ত্রের মুখে গরু ছিনতাই, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ট্রলারে চাঁদাবাজি, অবৈধভাবে বালু ও মাটি কেটে বিক্রির প্রহরা, মাদক চোরাচালানের নিরাপত্তারক্ষী- এমন নানা অপরাধের সাথে নিয়মিত জড়িয়ে থাকে এসব সশস্ত্র বাহিনী। অনেক সময় দুর্গম চরাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারসহ অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জের ধরে এক বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে আরেক বাহিনীর সদস্যদের গোলাগুলি, বোমাবাজির ঘটনাও ঘটে। তাদের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পান না ভুক্তভোগীরা। আতঙ্কে থাকেন সেখানকার সাধারণ বাসিন্দারা। আবার ভুক্তভোগীরাও ক্ষেত্রবিশেষে অপরাধী থাকায় এসব গল্প না বলাই থেকে যায়।

শক্তিশালী এসব বাহিনীর সদস্যদের অধিকাংশের নামে খুন, মারামারি, ডাকাতি, ধর্ষণ, চুরির মামলা রয়েছে। বিভিন্ন বাহিনীতে দুয়েকজন করে আছেন, ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া তিন বাহিনী প্রধানের নামে গড়ে ওঠা- লালচাঁদ বাহিনী, পান্না বাহিনী, সাফাত বাহিনীর সদস্য ছাড়াও পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি, গণবাহিনী ও লাল পতাকার উত্তরসুরিরাও। এসব অস্ত্রবাজ, বোমাবাজ সন্ত্রাসী বাহিনীতে জড়িয়ে পড়েছে উপজেলাটির অন্তত দুইশ তরুণ-যুবক। তাদের সংগঠক হিসাবে নেপথ্যে রয়েছেন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। বিভিন্ন বিশ্বস্ত সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে তথ্যদাতারা নিজেদের পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছার কথা জানান। সবার নজর ফাঁকি দিয়ে এই বড়বড় সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী কীভাবে সংগঠিত হলো, এমন প্রশ্নই দেখা দিয়েছে সচেতন মানুষের মাঝে।

সচেতন সমাজে উদ্বেগের কথা হলো, দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় প্রায় ঘনিয়ে আসছে। নির্বাচনী মৌসুমে এসব সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনীও এখন বেশ সক্রিয় হয়ে উঠছে। ভোটের রাজনীতিতে এখন তাদের কদর বাড়ছে বলেও মনে করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পুলিশের অভিযানে চরাঞ্চলের বাইরে থেকেও দুটি আ গ্নেয়াস্ত্র, চার রাউন্ড গুলি, একটি চাইনিজ কুড়াল ও একটি মোটরসাইকেলসহ দুজনকে আটক করা হয়েছে। সোমবার (২৫ সেপ্টেম্বর) গভীর রাতে দৌলতপুর থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের আলাদা অভিযানে তাদের আটক করা হয়।

এর মধ্যে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানে দৌলতপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের পূর্বপাড়া এলাকার নিজ এলাকা থেকে আসাদুল ইসলাম (৪২) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। এ সময় একটি ওয়ান শুটারগান, দুই রাউন্ড গুলি, একটি চাইনিজ কুড়াল ও নম্বরবিহীন একটি পালসার মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। অপরদিকে একই রাতে উপজেলার আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের একটি মাঠ থেকে নাটক অালী (৪৫) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে দৌলতপুর থানা পুলিশ। এ সময় তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়, একটি ওয়ান শুটারগান ও দুই রাউন্ড গুলি। আটককৃতদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দৌলতপুর থানায় একাধিক মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

দুর্গম চরাঞ্চলের এসব বাহিনীর অস্তিত্ব প্রসঙ্গে স্থানীয় ফিলিপনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নঈম উদ্দিন সেন্টু জানান, তার ইউনিয়নে আগে এক সময় এমন বাহিনী সক্রিয় থাকলেও এখন নেই বললেই চলে। চরাঞ্চলের আরেক ইউনিয়ন চিলমারীর চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান জানান, তিনি এ ধরনের সন্ত্রাসী বাহিনীর কথা শুনেছেন কিন্তু দেখেননি। তবে অস্ত্রসহ বিভিন্ন কালোবাজারি ব্যবসা চলে বলে জানান তিনি।

একেবারে ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন প্রাগপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামান মুকুল জানান, এলাকার মানুষ এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন। নানা ঘটনায় এলাকাবাসী অতিষ্ঠ থাকলেও কোনো সমাধান আসেনি।

দৌলতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, এ থানায় যোগ দেয়ার পর এখন পর্যন্ত এসব বাহিনী সম্পর্কে কোনো হিস্ট্রি ও তথ্য পাইনি। কারা এসব বাহিনীর সাথে জড়িত তা আমার জানা নেই। আদৌ এ ধরনের শক্তিশালী বাহিনীর অস্তিত্ব আছে কিনা তাও সঠিক বলা যাচ্ছে না, যদি থাকে তাহলে শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বর্তমানে চরাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। এ সময় তিনি তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।

এমকে