Bangladesh
This article was added by the user . TheWorldNews is not responsible for the content of the platform.

কী পেলেন কী হারালেন তামিম ইকবাল

কী পেলেন কী হারালেন তামিম ইকবাল

কী পেলেন কী হারালেন তামিম ইকবাল

সাইদুজ্জামান: মনোবিজ্ঞানে ‘ডাউন সিনড্রোম’ বলে একটি অসুখের নাম আছে। বিষাদগ্রস্ততার খবর এখন সমাজের সবার জানা। তামিম ইকবাল এর সর্বশেষ শিকার! শিকারই তো। অবসাদে আচ্ছন্ন না হলে আজ বিশ্বকাপগামী ফ্লাইটে অধিনায়ক হিসেবে তাঁর বসার কথা।

কিন্তু সেই তিনি এখন ওল্ড ডিওএইচএসের বাসায় মুখ ভার করে বসে আছেন নিশ্চয়। থাকারই কথা। ২০২৩ বিশ্বকাপে বড় কিছু করার স্বপ্ন তিনি লালন করে আসছিলেন ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার দিন থেকে। লর্ডসে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ বাজেভাবে হারের মন এমনিতেই সবার মন খারাপ।

টিম হোটেলে আরো বিষন্ন তামিম ইকবাল। এই বিষন্নতার অন্যতম একটি কারণ তাঁর নিজের পারফরম্যান্স, ‘একটা বিশ্বকাপেও আমি ভাল করতে পারিনি। জানি না, পরের বিশ্বকাপ খেলতে পারব কিনা। তবে যদি খেলি, জান দিয়ে দিব।

সেই স্বপ্ন মুঠোয়ও চলে এসেছিল তাঁর। আইসিসি সুপার লিগের তৃতীয় হওয়া বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক তো তামিমই ছিলেন। আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডের পর আচমকা আর্ন্তজাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর না নিলে আজ অধিনায়ক হিসেবেই তাঁর ভারতগামী ফ্লাইটে ওঠার কথা। নীতি নির্ধারক মহলে অন্য কোন ভাবনা থাকলেও নৈপুণ্যের কারণে তামিমকে অধিনায়কত্ব থেকে সরানোর অবস্থায় ছিল না বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। অন্দরমহলে কেউ কেউ কথাবার্তা বললেও তামিমকে অধিনায়কত্ব থেকে বাদ দেওয়ার পক্ষে যে যুক্তি গ্রহণযোগ্য হবে না, সেটি তারা জানতেন।

জানতেন বলেই ভিন্ন পথ নিয়েছিলেন। পথটা অবশ্য পরোক্ষে তামিমেরই দেখানো। একটু অস্বস্তির সঙ্গে সামান্য অবহেলায় তাঁকে ‘আহত’ করা যায়। এখনো মনে আছে, ২০১৮ সালে আমেরিকার ফোর্ট লডারডেলে সিরিজের শেষ দুটি টি-টোয়েন্টি খেলতে গেছে বাংলাদেশ দল। সেখানে প্রথম ম্যাচের আগেরদিন প্র্যাকটিসের পর উত্তেজিত তামিম। ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল অবসরই বুঝি নিয়ে ফেলবেন! প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ক্রিকেটের শুরু থেকে ম্যাচের প্রথম বল খেলে আসছেন তামিম। অথচ তৎকালীন কোচ স্টিভ রোডস কিনা সাফ জানিয়ে দেন, ইনিংসের শুরুতে নন-স্ট্রাইকিং এন্ডে থাকবেন তামিম। ক্যারিবীয়রা অফস্পিনার অ্যাশলে নার্সকে লেলিয়ে দিচ্ছিল বাংলাদেশের এই বাঁহাতি ওপেনারের পেছনে। কোচের এই যুক্তি তামিমের জাত্যাভিমানে লেগেছিল।

খুব কাছ থেকে ‘ডাউন সিনড্রোম’ সেবারই প্রথম দেখা। এরপর দিন গেছে, তামিমের ব্যাট চওড়া হয়েছে-শুধু পরিবর্তন হয়নি তাঁর মনোজগত। প্রচন্ড আবেগপ্রবণ তামিম হলেন সেই মানুষ, যিনি কাঁধে সমর্থণের হাত রাখলে উজার করে দেন। এটার দারুণ সদ্ব্যবহার করেছিলেন সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। তাঁর মূল্যায়ন ছিল, ‘একেকজনের মানসিকতা একেকরকম। তামিমের কথা যদি বলি, ওকে যদি আপনি সমস্যায় ফেলেন, ও বিগড়ে যাবে। ওর কাছ থেকে সেরাটা পাবেন না।’

তামিমের মনোজগতের এই রহস্য দ্বিতীয় মেয়াদে বাংলাদেশের হেড কোচের দায়িত্ব নেওয়া চন্দিকা হাতুরাসিংহেরও অজানা থাকার কথা নয়। তিনি শুধু দক্ষ স্ট্র্যাটেজিস্টই নন, মাইন্ড রিডারও। জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের মুখে সেরকমই শুনেছি। তো, দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর দিকেই তিনি নেটে তামিম ইকবালকে ধরিয়ে দেন, ‘তামিম, আমার মনে হয় তুমি আগের সেই তামিম নেই।’

তামিম ইকবাল আক্রান্তবোধ করেন। এরপর প্র্যাকটিসে আশেপাশে কোচ দেখলেই অধিনায়ক দূরে সরে যান। জানি না, গ্রেগ চ্যাপেল কোচ হয়ে ভারতে পা রাখার পর সৌরভ গাঙ্গুলীরও একই অবস্থা হয়েছিল কিনা। ভারতের তৎকালীন অধিনায়কের জোর সুপারিশে চ্যাপেলকে কোচ পদে দিয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। কিন্তু সেই তিনিই দায়িত্ব নিয়ে সৌরভ গাঙ্গুলীকে বাদ দেওয়ার মিশনে নামেন। 

শোনা যায়, চন্দিকাকে দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগের ব্যাপারে সমান উদ্যোমী ছিলেন তামিম ইকবাল। ঘনঘন ‘ডাউন সিনড্রোমে’ তাঁর আক্রান্ত হওয়ার শুরু তখন থেকেই। নানা ঘটনায় তামিম ইকবালের মনে হতে থাকে, জাতীয় দলের ক্রিকেট সিস্টেমে তিনি অনাহুত। অধিনায়ক হিসেবে যেটুকু গুরুত্ব পাওয়ার কথা, তা পাচ্ছেন না। কর্তাব্যক্তিরাও ইনিয়ে বিনিয়ে কোচের সুরে কথা বলতে থাকেন। তাতে অধিনায়কত্ব তামিমের কাছে বোঝা মনে হতে থাকে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের আগের রাতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, আর্ন্তজাতিক ক্রিকেটই আর খেলবেন না!

অবসর কে নিতে চায়? তাও যখন মসনদে টিকে থাকার নিশ্চয়তাও আছে। তবু প্রবলভাবে আক্রান্তবোধ করা থেকে সদ্ধিান্তটি নিয়েছিলেন তামিম ইকবাল। এরপর কেন সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছিলেন, সেটি তো সবারই জানা।

ফিরে এসে বিশ্বকাপের জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছেন তামিম ইকবাল। যে ধরনের চোট, তা সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। তবু নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষ প্রথম দুই ম্যাচ খেলেছেন। ঝাঁপিয়ে পড়ে ফিল্ডিংও করেছেন। চোট আগলে খেলা ক্রিকেটারের ঝঁপাঝাঁপি করার কথা নয়। ব্যাট হাতে ৪৪ রান আহামরি কিছু নয়। তবে ইনিংসটা স্বস্তিদায়ক ছিল সবার জন্য। কিন্তু অস্বস্তি অনুভব করেছিলেন তামিম। ম্যাচের পর প্রশ্নের উত্তরে সেটি বলেওছিলেন সংবাদ মাধ্যমে। সঙ্গে এটাও জানিয়েছিলেন যে, নির্বাচকদের তিনি জানিয়েছেন যেন বিশ্বকাপ স্কোয়াড নির্বাচনের সময় তাঁর চোটের বিষয়টি বিবেচনায় রাখেন। এটা কেন বললেন তামিম- হা রে রে করে ওঠেন ক্রিকেটের নীতি নির্ধারকরা। তারমানে চোটের কথা গোপন করে বিশ্বকাপে গেলে ভাল করতেন তামিম ইকবাল? নিজেকে পুরো ফিট দাবি করে বিশ্বকাপ চলাকালে যদি ছিটকে পড়তেন তামিম? আর তাঁর চোট যে যখন তখন ফিরে আসতে পারে, এটা তো টিম ম্যানেজমেন্টেরও জানা। শুধু বলে ফেলেই দোষ করেছেন তামিম! অবশ্য ক্রিকেটে আনুষ্ঠানিকভাবে ভুল তথ্য পরিবেশন করা পুরনো রীতি। এমন কত সংবাদ সম্মেলনে যে প্রশ্নকর্তাও জানেন ফিরে আসা উত্তর নির্জলা মিথ্যা!

যাক, সেসব কথা। তামিম ইকবাল সবশেষ বিষাদগ্রস্ত হন সোমবার রাতে। বোর্ড সভাপতি ফোন দিয়েছিলেন কিছু প্রস্তাবনার কথা জানাতে।  এক. আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে বিশ্রাম নেন তামিম। 

দুই. তা না হলে মিডল অর্ডারে খেলতে হবে। আফগানিস্তান ম্যাচে লিটন দাসের সঙ্গে মেহেদী হাসান মিরাজকে ওপেন করালে ভাল হয়।

প্রথম প্রস্তাবেই বাংলাদেশের সফলতম ওপেনার আক্রান্তবোধ করেন। সারাজীবন ওপেন করা তামিম মিডল অর্ডারে খেলার প্রস্তাব আর নিতে পারেননি। বুঝে ফেলেন এ তো কোচের শিখিয়ে দেওয়া বুলি! সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বকাপে যাবেন না বলে বোর্ড সভাপতিকে জানিয়ে দেন তামিম ইকবাল খান। তাতে টিম ম্যানেজমেন্ট এবং নির্বাচকদের কাজটা আপাত সহজ হয়ে যায়। কারণ অধিনায়কত্বের মত চাইলে বিশ্বকাপের টিকিটও নিজের দখলে রাখতে পারতেন তামিম ইকবাল। তাঁর জন্য দরজা খোলাই ছিল। তবে ‘রেপুটেশন’ বলে একটা কথা আছে। অনাহুত হয়ে সেটির অসন্মান করতে চাননি তামিম ইকবাল। বিষন্নতার আড়ালে তাঁর বড় প্রাপ্তি- নিজের সুনাম নিয়ে কাউকে খেলার সুযোগ তো আর দেননি!-কালের কণ্ঠ