Bangladesh
This article was added by the user . TheWorldNews is not responsible for the content of the platform.

অর্থ পাচার উৎসাহিত হবে!

পাচার হওয়া টাকা অর্থনীতির মূল স্রোতে আনতে চান অর্থমন্ত্রী, বৈষম্যের শিকার হবেন সৎ করদাতারা : বিশ্লেষকদের অভিমত

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরাতে প্রস্তাবিত ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে প্রস্তাব করে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, কর দিলেই পাচারের টাকা বিনা প্রশ্নে ‘সাদা’ হয়ে যাবে। অর্থমন্ত্রীর দাবি, পাচারের টাকা দেশের অর্থনীতির মূল স্রোতে আনতে এই প্রস্তাব করা হয়েছে। এর পরই অর্থনীতিবিদরা প্রশ্ন তুলে বলেছেন, কর দিলেই পাচারের টাকা দেশে ফিরে আসবে? অর্থমন্ত্রীর এমন প্রস্তাবে সায় দেননি ব্যবসায়ীরাও। এছাড়া বিদ্যমান অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনেও টাকা পাচারকারীদের অর্থদণ্ডের সঙ্গে কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রেও অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাব আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।

জাতীয় সংসদে গত বৃহস্পতিবার ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বিদেশে পাচার হওয়া টাকা দেশে আনার বিষয়ে আয়কর অধ্যাদেশে নতুন বিধান সংযোজনের প্রস্তাব করেন। এই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বিদেশে অর্জিত সম্পদ দেশে আনা হলে স্থাবর সম্পত্তির জন্য ১৫ শতাংশ, অস্থাবর সম্পত্তির জন্য ১০ শতাংশ এবং নগদ অর্থ আনতে ৭ শতাংশ হারে কর দিলে ওই সম্পদের বিষয়ে প্রশ্ন তুলবে না আয়কর বিভাগ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ভোরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন এবং আর্ন্তজাতিক আইন অনুযায়ী অর্থ পাচার একটি গুরুতর অপরাধ। তিনি বলেন, দেশে বা বিদেশে যারা বৈধভাবে আয় করেন; তাদের ক্ষেত্রবিশেষে ২০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয়। আর এ ধরনের অপরাধকে ছাড় দিয়ে মাত্র ৭ থেকে ১৫ শতাংশ কর দেয়ার মাধ্যমে পাচার হওয়া টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া গ্রহণযোগ্য নয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রীর এই প্রস্তাব করদাতাদের জন্য বৈষম্যমূলক। এতে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হবেন। এছাড়া দেশে টাকা আনার যে আশা নিয়ে সরকার এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে- সেটাও পূরণ হবে না বলে মনে করেন তিনি।

দেশের বিদ্যমান মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি অর্থ পাচার করলে অথবা অর্থ পাচারের চেষ্টা, সহায়তা বা ষড়যন্ত্র করলে সর্বনি¤œ ৪ বছর ও সর্বোচ্চ ১২ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এছাড়াও অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির দ্বিগুণ মূল্যের সমপরিমাণ বা ১০ লাখ টাকার মধ্যে যেটি বেশি সেই অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অর্থদণ্ড পরিশোধে ব্যর্থ হলে অপরিশোধিত অর্থদণ্ডের পরিমাণ বিবেচনায় অতিরিক্ত কারাদণ্ড দেয়ার বিধান আছে এই আইনে। পাশাপাশি আদালত অর্থদণ্ড বা দণ্ডের অতিরিক্ত হিসাবে দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করতে পারবে। আর ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯-১৮ সাল পর্যন্ত বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে সোয়া ৪ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়। আর দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান টিআইবির হিসেবে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার থেকে দেড় হাজার কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টাকা পাচার করা বাংলাদেশে একটি অপরাধ এবং শাস্তির বিধান রয়েছে। কর দেয়ার মাধ্যমে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনার সরকারের এই পদক্ষেপ আইনবিরোধী বলেও মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

তবে পাচারের টাকা দেশে ফেরানোর বিষয়ে খুবই আশাবাদী অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, কখনো কখনো ‘মিসম্যাচ’ হয়ে যায়। কখনো কখনো বিভিন্ন কারণে টাকা চলে যায়। টাকা পাচার হয়নি একথা আমি কখনো বলিনি। এই টাকাগুলো যদি পাচার হয়ে থাকে, এটা আমরা ধারণা করছি যে পাচার হয়ে গেছে। অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, অর্থ পাচারকারীদের এ ধরনের সুবিধা এর আগে বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ দিয়েছে এবং সফল হয়েছে। যদি টাকা পাচার হয়ে থাকে তাহলে সেটা এই দেশের মানুষের হক। আমরা এগুলা ফেরত আনার চেষ্টা করছি। এখানে বাধা দেবেন না। বাধা দিলে টাকা ফেরত আসবে না বলেও মনে করেন অর্থমন্ত্রী।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ করদাতা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী এবং অর্থনীতিবিদ সবার বাধা উপেক্ষা করে পাচারকারিদের অনৈতিক সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এটা সৎ করদাতাদের জন্য চপেটাঘাত বলেও আখ্যায়িত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সৎ করদাতারা যেখানে ২২ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর দেন, সেখানে অর্থ পাচারকারিরা আয়কর দিবেন মাত্র ৭ থেকে ১৫ শতাংশ। তাও কোনো ধরনের প্রশ্ন ছাড়াই। এতে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যারা বিদেশে টাকা পাচার করেছেন তারা সেখানে সম্পদের মালিক হয়েছেন, উপভোগ করছেন, সেগুলো ছেড়ে দিয়ে সেই অর্থ তারা দেশে নিয়ে আসবেন- এমনটি ভাবাও বাস্তবসম্মত নয়।

অর্থ পাচারকারিদের অনৈতিক সুবিধা দেয়ার বিরোধী ব্যবসায়ীরাও। গতকাল শনিবার বাজেট প্রতিক্রিয়ায় এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, আমরা আগেও বলেছি- পাচার হওয়া টাকা বিনা প্রশ্নে দেশে আনার সু?যোগ ব্যবসায়ীরা সমর্থন ক?রেন না। কারণ এ ধরনের সু?যোগ দিলে সবাই এতে উৎসাহী হবে। তিনি ব?লেন, আমি এখন ২২ থেকে ৩০ শতাংশ কর দি?য়ে টাকা সাদা করব। অন্য?দি?কে বিদেশ থেকে ফেরত আন?লে ১৮ শতাংশ ছাড় পাওয়া যা?চ্ছে। তাই আমরা এটা সমর্থন করি না। কারণ এতে করে ভালো ব্যবসায়ীরা রপ্তানিতে নিরুৎসাহিত হবে। এখন ডলারের সংকট তাই সরকার হয়তো ডলারের প্রবাহ বাড়াতে এ সু?যোগ দি?য়ে?ছে। ত?বে ব্যবসায়ীরা এটা সমর্থন করে না।

এসআর