logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo logo
star Bookmark: Tag Tag Tag Tag Tag
Bangladesh

মানুষ তারেই বলি ...

কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম এক আশ্চর্য। পৃথিবীর বিভিন্ন ঘটনা ও ছবি সপ্তাশ্চর্য হিসেবে প্রকাশ পায়। কবি-সাহিত্যিকদের বেলায় তেমন কোনো হিসাব নেই। তবে আমার কাছে সুকান্তকে বাংলা সাহিত্যের এক সপ্তাশ্চর্য বলে মনে হয়। এ কবি যা বলার বলে ফেলেছেন তার স্বল্প-আয়ুর জীবনে। মাত্র একুশ বছর জীবন পেয়েছেন তিনি। কিন্তু এর মধ্যেই মানুষ ও জীবন নিয়ে এতকিছু আর এমন কিছু বলে ফেলেছেন যা তাঁর দ্বিগুণ বয়সী বা কয়েকগুণ বয়সী কবিরাও বলতে পারেননি। সুকান্ত যেমন বলেছেন, জন্মের পরপরই নতুন শিশু উদ্ধত হাতে চিৎকার দিয়ে বলে তার অধিকারের কথা:

‘যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে
তার মুখে খবর পেলুম:
সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক,
নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার
জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে।’

পৃথিবীতে কত শিশুই তো জন্মেছে এর আগে, কত কবিই তো লিখেছেন কবিতা। সদ্যোজাত শিশু জন্মেই যে অধিকারের কথা বলতে পারে তা জেনেছে কে আর? বুঝেছেই বা কে? আর তা সবাইকে জানাতে লিখে গেছেই বা ক’জন?

আশ্চর্য এই কিশোর কবি ‘১৮ বছর বয়স’ কবিতায় ১৮ বছর বয়সীদের গুণগান, স্পর্ধা, গ্লানি তুলে ধরার পর বলেছেন: ‘এ বয়স তবু নতুন কিছু তো করে!’ শনিবারের বিকেল থেকে ফেসবুকে গিয়ে মনে হলো তাঁর এই ছত্রখানি। তাঁর কবিতায় আসা ভাষার মতো করেই হঠাৎ মনে হলো- আরে! ফেসবুক তবু কত কিছুই তো করে!

হানিফ সংকেতের ‘ইত্যাদি’ এখন আর লোকে গোল হয়ে বসে দেখে না। (আমার কাছে এমনটাই মনে হয়, যেমন আগে আমিও বিটিভির সমনে গোল হয়ে বসে থাকতাম ইত্যাদির জন্য। এখন আর থাকি না।) তবে এই অনুষ্ঠানটি কোনো না কোনোভাবে এখনো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। আমি যেমন এটি পেলাম ফেসবুকে। সেখানে আজ সবাই একটি মানবতার গল্প বলছেন, দুজন মানুষের গল্প বলছেন। যে গল্প তুলে ধরেছে ‘ইত্যাদি’। খেয়াল করলাম যারা বিটিভিতে অনুষ্ঠানটি দেখেননি তারাও এই বিষয়ে লিখছেন এবং প্রশংসা করছেন। হানিফ সংকেত প্রশংসা পাচ্ছেন। তবে আপামর ফেসবুক জনতা প্রশংসার ডালি খুলে বসেছেন অন্য দুজনের জন্য। যারা দুজন চিকিৎসক, যাদের তুলে ধরেছেন হানিফ সংকেত ‘ইত্যাদি’ অনুষ্ঠানে। সাধারণ মানুষের যেকোনো ভালো কিছুর প্রশংসার এই প্রবণতাকে ইতিবাচক বলব। এটা সম্ভব হয়েছে ফেসবুকের কল্যাণে। তাই মনে হলো, আসলে ফেসবুকও অনেক কিছুই করে!

তা মানুষ ফেসবুকে কী গল্প বলছেন, কার গল্প বলছেন? মানুষ বলছেন দুজন মানুষের কথা, দুজন মানুষের গল্প। তাহলে আমরা কি মানুষ নই? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আবার নিজের গায়েই লাগে। আসলে আমরা ঠিক মানুষ নই, মানুষের মতো। কিংবা বলতে পারি অর্ধেক বা সিকি মানুষ, পরিপূর্ণ মানুষ না। মানুষ হলে অন্যরকম হতো। মানুষ হলে আমাদের সমাজ আর দেশটার চেহারা আরও সুন্দর হতো, আরও ভালো হতো। কেমন ভালো হতো? এই বিকেলে ঘর থেকে বেরিয়ে যে ধুলোর জঞ্জাল পার হতে হলো তা লাগত না। আমরা মানুষ হলে পথে এত ধুলো উড়ত না।

ফেসবুকে প্রশংসার ডালি যারা পাচ্ছেন তাঁদের প্রতি সম্মান আর ভালোবাসা। যারা সুদূর আমেরিকা থেকে এই বাংলায় এসেছেন কেবল মানুষের সেবা করতে। চিকিৎসক পৃথিবীতে অনেকেই হন, বাংলাদেশে হন ভুরি ভুরি। কিন্তু  ক’জন আছেন ডাক্তার জেসিন ও তার স্ত্রীর মতো মানুষ-চিকিৎসক? এখন এই পৃথিবীতে আমাদের চিকিৎসক দরকার, তবে বেশি দরকার মানুষ-চিকিৎসকের। মানুষ কে? দেখতে কেমন? মানুষ ডাক্তার জেসিন, মানুষেরা ডাক্তার জেসিনের মতো।

টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ে একজন বিদেশি ‘মানুষ-চিকিৎসক’ দীর্ঘদিন মানুষের সেবা করে পরপারের বাসিন্দা হয়েছেন। তার নাম ডা. এড্রিক বেকার। অনন্তের পথে যাওয়ার আগে তিনি বলে গেছেন যদি সম্ভব হয়, বাংলাদেশের কোনো একজন চিকিৎসক যেন তার রেখে যাওয়া কর্মের হাল ধরেন। বাংলাদেশে চিকিৎসক তো অনেক আছেন কিন্তু ‘মানুষ-চিকিৎসক’ কই? শেষ পর্যন্ত আর এই দেশে তেমন কাউকে পাওয়া গেল না। এই খবর জেনে আমেরিকা থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে চলে এসেছেন ডাক্তার দম্পতি জেসিন ও মেরিন্ডি। তাঁরা এগিয়ে নিয়ে যেতে চান আরেক মানুষ-চিকিৎসকের কর্মযজ্ঞ, তাঁর মহৎ কর্ম। যে কর্ম আসলে কর্ম নয়, সেবা; গরিব মানুষদের সেবা; যাদের সামর্থ্য নেই অর্থ দিয়ে সেবা কিনবার। আমাদের দেশে কোনো চিকিৎসকই গরিবের সেবা করেন না এমন নয়। করেন, অনেকেই অনেক জায়গায় ছোট-বড় পরিসরে গরিব রোগীর সেবা দেন। কিন্তু ডা. জেসিনদের মতো করে কেউ দেন বা দিচ্ছেন এমন শোনা যায় না। আহ, যদি শোনা যেত এমন দু-একটি গল্প!

জেসিন ও মেরিন্ডি আমেরিকা থেকে সাত সাগর তের নদী পেরিয়ে এখানে এসেছেন। আর আমাদের এখানে ঢাকা থেকে এক পা কোথাও ফেলতে চান না কোনো চিকিৎসক। একবার যদি কোনোরকমে মফস্বলে ঠেলে পাঠানো যায়ও, নানা ফন্দি-ফিকির, ঘুষ-তদবিরের খেলা শুরু হয়ে যায় সাথে সাথে। তারপর অল্প সময়েই তদবির যুদ্ধে সফল হয়ে রাজধানীতে ফিরে আসেন সেই চিকিৎসক। আমি প্রায়ই ভাবি, আমরা কি এদের মানুষ বলব নাকি চিকিৎসক বলব? আমাদের দেশে অনানুষ্ঠানিক একটা অপবাদ আছে, প্রায়ই লোকে তা ব্যবহার করে। যেমন ‘আরে ভাই আপনি তো মানুষ না, আপনি একটা ... ’। এদেশের যে চিকিৎসকেরা সেবাধর্ম ভুলে গিয়ে কেবল নিজের আর পরিবারের স্বার্থ দেখে তাদেরও এমন ভাষায় সম্বোধন করতে মাঝে মাঝেই মনে চায়। তারা আসলে মানুষ নন, তারা চিকিৎসক।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তাঁর কবিতায় যে মানুষের কথা বলেছেন, যে মানুষের ছবি এঁকেছেন ডা. জেসিন ও মেরিন্ডি যেন ঠিক অনুরূপ মানুষ। কবি বলেছেন:

‘কেবল পরের হিতে প্রেমলাভ যার,
মানুষ তারেই বলি মানুষ কে আর।’

আমেরিকার আয়েশি জীবন ছেড়ে, বাচ্চাদের উন্নত জীবনের সুযোগ ছেড়ে দিয়ে মধুপুর গড়ে এসে যারা মানুষের সেবায় নিয়োজিত হয়েছেন; যারা কেবল এই সেবা করার জন্যেই নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে দূরে ঠেলে রেখে ভিন্ন ভাষা আর ভিন্ন সংস্কৃতিকে আপন করে নিতে বদ্ধপরিকর হয়েছেন এবং সেজন্য নিয়ত সংগ্রাম করছেন; নিজের এবং পরিবারের খাদ্যাভ্যাস পর্যন্ত বিসর্জন দিতে যারা এতটুকু পিছপা হননি- তাদেরই তো বলা যায় ঈশ্বরচন্দ্রের সেই মানুষ। যে মানুষ কেবল পরের কল্যাণের কথা চিন্তা করে।

ডা. জেসিনদের এমন কর্ম ও সেবার উদ্যম আমাদের দেশের চিকিৎসকদের জন্য প্রেরণা হোক। অতীতে না হলেও আগামীতে অন্তত এই বাংলাদেশ কিছু চিকিৎসক পাক যাদের আমরা ‘মানুষ চিকিৎসক’ বলতে পারব। শুধু চিকিৎসক কেন, সমাজের সবক্ষেত্রেই ‘মানুষ’র দেখা যেন বেশি পাই। মানুষ-শিক্ষক, মানুষ-সাংবাদিক, মানুষ-উকিলে ভরে উঠুক সমাজ। সেজন্য মানুষ ডা. জেসিনকে দেখে কেবল ফেসবুকে প্রশংসার ডালি সাজানো নয়, নিজে আমরা যেন মানুষ হতে পারি যার যার ক্ষেত্রে, সেটাই হোক চাওয়া।

লেখক: সাংবাদিক

ঢাকা/তারা

Themes
ICO